শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । ৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রায়পুরে কিশোর-কিশোরীর আত্মহত্যা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন

লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি »

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার ঘটনা বাড়তে থাকায় জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ৮ মার্চ একই দিনে এক কিশোরী ও এক কিশোরের আত্মহত্যার ঘটনা এলাকাজুড়ে শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। এমন ঘটনার পর সন্তানদের মানসিক নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরা। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৮ মার্চ উপজেলার পৃথক এলাকায় এক কিশোরী ও এক কিশোর আত্মহত্যা করে। একই দিনে এমন দুটি মর্মান্তিক ঘটনার পর এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই মনে করছেন, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বাড়তে থাকা মানসিক চাপ ও হতাশা এ ধরনের ঘটনার অন্যতম কারণ।

সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক গঠন অত্যন্ত সংবেদনশীল। পারিবারিক অভিমান, পড়াশোনার চাপ, সম্পর্কজনিত সমস্যা কিংবা সামাজিক অপমান অনেক সময় তাদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা তাদের সমস্যার কথা পরিবার বা কাছের মানুষদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে পারে না। ফলে একাকীত্ব ও হতাশা তাদের চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।

এছাড়া পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়া এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের প্রভাবও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমান, ট্রল বা অনলাইন বুলিং অনেক সময় কিশোরদের মানসিকভাবে ভেঙে দেয়।

এদিকে কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর জেলা সদর কিংবা রায়পুর উপজেলা সদর পর্যায়ে পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা মনোরোগ চিকিৎসক না থাকায় অনেক সময় সন্তানদের মানসিক সমস্যার চিকিৎসা করানো সম্ভব হয় না। ফলে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও পরামর্শ না পাওয়ায় অনেক কিশোর-কিশোরী মানসিক সংকটে পড়ে যাচ্ছে।

একজন অভিভাবক বলেন, “আমাদের সন্তানদের অনেক সময় মানসিক সমস্যা হয়, কিন্তু সহজে কোনো মানসিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে যদি মানসিক ডাক্তার থাকতো, তাহলে অনেক সমস্যা আগে থেকেই সমাধান করা যেত।”

অভিভাবকরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অন্তত একজন করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া জরুরি, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে পরিবার ও সমাজ। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং মানসিকভাবে সহায়তা করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি স্কুল-কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের জন্য কাউন্সেলিং বা মানসিক পরামর্শসেবা চালুর বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

সচেতন মহলের মতে, আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। বরং মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তিকে সহানুভূতি ও সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে এমন মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

রায়পুরে ৮ মার্চ একই দিনে দুই কিশোর-কিশোরীর আত্মহত্যার ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—কিশোরদের মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও সরকারের সম্মিলিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

 

 

জাগো সংবাদ/আরাফাত/জাকির

শেয়ার করুন »

Comments are closed.