
আদালতের এজলাসে বিচারকার্য চলাকালে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাদিকুল রহমান লিংকনকে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বরিশাল আদালতপাড়া। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ডিবি পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার ও পরবর্তী বিচারিক নির্দেশনাকে ঘিরে আইনজীবীদের বিক্ষোভ, আদালত বর্জন এবং বিচারক অপসারণ দাবির ঘটনায় আইনাঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, বুধবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বরিশাল আদালত প্রাঙ্গণে নিজ চেম্বার থেকে অ্যাডভোকেট সাদিকুল রহমান লিংকনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরে তাকে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক এস এম শরীয়াত উল্লাহ তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল মানুন উল ইসলাম গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে। আদালত সূত্রে অভিযোগ, বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারকার্য চলাকালে অ্যাডভোকেট লিংকন এজলাসে প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন এবং বিচারকের সামনে চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করেন। এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।এর আগে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুসের জামিনের প্রতিবাদে আইনজীবীদের একাংশ আদালত বর্জন কর্মসূচি পালন করেন। তাদের অভিযোগ, গুরুতর মামলায় নিম্ন আদালত থেকে জামিন দেওয়ার ঘটনাই আইনজীবীদের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং পরবর্তীতে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।বরিশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হাফিজ আহমেদ বাবলু বলেন, জামিন সংক্রান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল এবং তারই ধারাবাহিকতায় বিক্ষোভ ও আদালত বর্জন কর্মসূচি শুরু হয়। একই সঙ্গে তিনি গ্রেপ্তারের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিচারকের অপসারণ দাবি করেন।বার সভাপতির গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীরা বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। গারদখানার সামনে আইনজীবীদের অবস্থানের কারণে তাকে কারাগারে নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেগ পেতে হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আদালত এলাকায় সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও ডিবির অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের এজলাসে বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ যেমন গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয়, তেমনি বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশের সাংবিধানিক সীমা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিচার বিভাগের মর্যাদা, আইনজীবীদের পেশাগত আচরণবিধি এবং বিচারিক স্বাধীনতা—এই তিনটি প্রশ্ন এখন ঘটনাটির কেন্দ্রে চলে এসেছে।এদিকে আইনজীবীদের একাংশ ঘোষণা দিয়েছেন, বিচারক অপসারণের দাবিতে চলমান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং মামলার তদন্ত চলমান।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা কেবল একটি ফৌজদারি অভিযোগের বিষয় নয়; বরং আদালতপাড়ার পেশাগত শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে ঘটনার তদন্ত, বিচারিক পদক্ষেপ এবং আইনজীবী সমাজের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাগো সংবাদ/আরাফাত/এসকে