বৃহঃস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বপ্নজয়ী টাইগাররা!

অনলাইন ডেস্ক »

ইতিহাস নাকি স্বপ্নজয়? যদি হয় ইতিহাস গড়েই স্বপ্নজয়? রয়েল বেঙ্গল টাইগাররা করে দেখালো সেটাই। দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর পেরিয়ে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ২২ বছর পর এসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম জয়, কিউইদের মাটিতেও তাদের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরণের ফরম্যাটেই প্রথম জয়। ইতিহাস নয় তো কি এটা?

সাথে ছিলো ১৬ কোটির স্বপ্ন, সেই স্বপ্নই তো অবশেষে পূরণ করেই ছাড়লো মমিনুল বাহিনী। মাউন্ট মঙ্গানুইয়ের সকালের রোদটা যেনো চোখের পলকেই ধারণ করলো লাল সবুজের আভা। যেই লাল সবুজের পতাকাকে আজীবন স্যালুট দিয়ে এসেছেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এবাদত, সেই এবাদতকে কি এবার লাল সবুজের ১৬ কোটির পক্ষ থেকে একটা স্যালুট দেয়া যায়?

কাইল জেমিসনের বল ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ঠেলে দিয়েই রানের জন্য ছুটলেন মুশফিক। বলও ছুটলো বাউন্ডারির দিকে, একসময় ছুয়েই ফেললো বাউন্ডারির সীমানা। ইতিহাস লেখা হয়ে গেলো সেখানেই। ৮ উইকেটের ঐতিহাসিক এক জয় টাইগার বাহিনীর। গত ১১ বছরে যে ইতিহাস লিখতে পারেনি ভারত-পাকিস্তানের কেউ, এমনকি পারেনি এশিয়ার কেউই। বাংলাদেশ করে দেখালো সেটিই।

বর্তমান টেস্ট বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, টেস্ট র‍্যাংকিং এর নাম্বার ওয়ান দল, দেশের মাটিতে ২০১৭ সালের পর হারেনি কোনো টেস্টে, এশিয়ার দলগুলোর সাথে শেষ হার তো আরও আগের এক কল্পকাহিনীর মতোই, সেই ২০১০ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে। উড়ন্ত সেই নিউজিল্যান্ডকেই কিনা তাদের মাটিতে হারিয়ে দিলো বাংলাদেশ।

তাসমান পাড়ের দেশটির বিপক্ষে শুধু জয়ই না, রীতিমত পুরো টেস্টে আধিপত্য বিস্তার করে জয়। বাংলাদেশকে এমনভাবে শেষ কবে কেউ খেলতে দেখেছে সেটি মনে করতে গেলেও হয়তো ক্যালেন্ডারের পাতা খুলে বসতে হবে। শুধু টেস্টই নয়, ক্রিকেটের যে কোনো ফরম্যাটেই গেলো বছরটা যে একেবারে ছন্নছাড়া এক বাংলাদেশকে দেখেছে বিশ্ব। গত মাসেই ঘরের মাঠে পাকিস্তানের কাছে হয়েছে নাস্তানাবুদ। কোনো ভক্ত সমর্থকই হয়তো ভাবেননি নিউজিল্যান্ড গিয়ে তাদের মাটিতেই এত বড় এক ইতিহাস রচনা করে আসবে টাইগার বাহিনী।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ব্যর্থতা, পাকিস্তান সিরিজে লজ্জাজনক হার, বোর্ডের অন্তর্দ্বন্দ, সব মিলিয়ে সমালোচনার তীর সাথে করেই নিউজিল্যান্ডের মাটিতে পা রেখেছিলো মমিনুল-মুশফিক-লিটনরা। সেখানে গিয়েও কোয়ারেন্টাইন, করোনা সব মিলিয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা টীম বাংলাদেশের।

মাউন্ট মঙ্গানুইয়ের বে ওভালে মমিনুল যখন টস জিতে বোলিং নিলেন তখনও বাংলাদেশের ভক্ত সমর্থকদের আশা ছিলো হয়তো বা একটা লড়াই। প্রথমদিনের স্কোরকার্ডও যেন মমিনুলের সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণে উঠেপড়েই লেগেছিলো। ডেভন কনওয়ের সেঞ্চুরিতে যেনো মনে হচ্ছিলো নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশকে কুপোকাত করবে অনায়াসেই। এই টেস্টে নিউজিল্যান্ডের সাফল্য বলতে ঐটুকুই। প্রথম দিন বিকেল থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু টাইগারদের। মিরাজ-শরীফুলরা মিলে ঐদিন শেষ সেশনে ম্যাচে ফেরায় বাংলাদেশকে। প্রথম দিন শেষ হয় দুই দলের সমান ভাবেই।

দ্বিতীয় দিন সকাল থেকে বাকি গল্পটা পুরোটাই লাল সবুজের। কনওয়ের সেঞ্চুরির পরও নিউজিল্যান্ড এগোতে পারেনি বেশিদূর। প্রথম ইনিংসে কিউইরা অলআউট ৩২৮ রানেই। নিজেদের প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে বাংলাদেশের শুরু থেকে শেষ। দলীয় পারফরম্যান্সে গ্রাফটা সবারই উপরের দিকে। তরুণ শান্ত আর জয়ের হাফ সেঞ্চুরিতে শুরু, তারপর টাইগার অধিনায়ক মমিনুলের ৮৮ আর টেস্টের ধারাবাহিক পারফর্মার লিটন দাসের ৮৬। প্রথম ইনিংস শেষে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে ৪৫৮ আর সাথে সবচেয়ে বেশি ওভার (১৭৬.২) টিকে থাকার রেকর্ড।

চতুর্থ দিনে এসে বাংলাদেশের লিড ১৩০ রানের। নিউজিল্যান্ড তাদের দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুটাতেও কিছুটা প্রাধান্য কিউইদের। তারপর গল্পটা লিখলেন বাংলাদেশের বোলাররা। বোলার বলতে এক এবাদোত হোসেনেরই। আগের ১০ টেস্টে ১১ উইকেট পাওয়া এবাদত যেন নিজের সবকিছু জমিয়ে রেখেছিলেন এই টেস্টের জন্য। বাংলাদেশের কোনো পেসার যে বিদেশের মাটিতে এভাবেও বল করতে পারে, বলের সুইং আর টানা গতি, কি ছিলো না এবাদতের বোলিংয়ে।

নিউজিল্যান্ডের দুই উইকেট পড়ার পর উইল ইয়ং আর রস টেইলর মিলে ৭৩ রানের জুটি গড়ে ফেলেছিলেন। তবে হটাৎই দৃশ্যপটে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সৈনিক এবাদত হোসেন। এক ওভারেই দুটি আর নিজের পরপর দুই ওভারে তিন উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশের মুখের হাসিটা আর ম্লান হতে দেননি এই এবাদত। বিমান বাহিনীর হয়ে দেশের প্রতিরোধে হাতে ধরেছেন অস্ত্র। এবার যেন যুদ্ধবিমানের গতিতেই ছোটালেন বাংলাদেশের আক্রমণকেও। মাত্র ১৭ রানের লিড নিয়ে চতুর্থ দিন শেষ করা নিউজিল্যান্ডকে হারানোর হাতছানি তো তখন থেকেই।

পঞ্চম দিন টাইগারদের কাজ ছিলো শুধু নিউজিল্যান্ডকে যত কম রানে পারা যায় বেঁধে ফেলে নিজেদের নামটা ইতিহাসের পাতায় তুলে ফেলা। ইতিহাসের মাঝে বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছিলেন একজন, রস টেইলর। কোনো এক বিশেষ কারণে সবসময় বাংলাদেশের সাথে ভালো খেলে আসা টেইলর এবার আর পারলেন না সুবিধা করতে।

পঞ্চম দিন সকালে মাঠে নেমেই টেইলরের স্ট্যাম্প উড়িয়ে শঙ্কা দূর করেন ঐ এবাদতই। এবাদত শেষমেশ নিয়েছেন ৪৬ রান দিয়ে ৬ উইকেট। ২০১৩ সালে রবিউল ইসলামের পর এই প্রথম বাংলাদেশি বোলার বাইরের মাটিতে টেস্টের এক ইনিংসে ফাইফার পেলেন। এই টেস্টে বলার মতো পারফরম্যান্স ছিলো না তাস্কিন আহমেদের। সতীর্থদের দেখে এবার জ্বলে উঠলেন এই স্পিডস্টার। রাচিন রবীন্দ্র আর টিম সাউদির উইকেট তুলে নিয়ে এবাদতের সাথে উল্লাসে মাতলেন তিনিও। অবশেষে নিউজিল্যান্ড অলআউট ১৬৯ রানেই। মমিনুলদের সামনে টার্গেট ৪০ রানের। স্বপ্নকে তো হাতের মুঠোই বলাই যায়।

৪০ রানের টার্গেটে ব্যাটিংয়ে নেমে ৩ রানেই সাদমান আউট হলে একটু কি আবার পুরোনো ভয় মোচড় দিয়েছিলো দূরের এই লাল সবুজের দেশের অগণিত ক্রিকেট পাগল দর্শকদের। না, তেমন কিছু আর হতে দেননি মমিনুল আর শান্ত। ৩৪ রানের মাথায় শান্ত আউট হয়ে গেলেও মমিনুলের সাথে মুশফিকের ঐ ইতিহাস সৃষ্টিকরা ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টের বাউন্ডারি।

সুদূর নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুইতে উড়লো বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা। দলের সবার অবদানের হলেও সবচেয়ে বড় অবদানটা অবশ্য এবাদত হোসেনেরই। তাই তো ম্যাচসেরার পুরষ্কারটাও উঠলো তার হাতেই।

লাল সবুজের ইতিহাসের পাতায় লেখা হলো আরেকটি পাতা। আগামী প্রজন্মের কাছেও যেই ইতিহাস হতে পারে অণুপ্রেরণার।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »